আমার তিন টাকার সুখ

 নদীর পানিতে জোৎস্না দেখতে ভালোই লাগছে। হালকা বাতাসে পদ্মার পাড়ে একা একাই বসে আছি। সময়টা এখন রাত ১০ টা বেজে ২৩ মিনিট। জায়গাটা ফুল বাড়িয়া।রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের অধীনেই জায়গাটা। আজকের দিনটা স্পেশাল আমার জন্য।  অবশ্য পূর্বের কোন ঘটনার কারণে না। আজকের দিনটা স্পেশাল হইছে আজকেই এবং সন্ধার পর থেকেই। পুরোনো দিনের কথা খুব মনে পড়ছে। যখন আমি স্কুলে যাওয়ার সময় প্রতিদিন ৩ টাকা করে পেতাম। সকালবেলা বাসা থেকে বের হয়ে তালতলা বাজারে  আব্বুর সামনে গেলেই ৩ টাকা হাতে চলে আসতো। খুব স্পষ্ট মনে আছে। আব্বু একদিন রসিকতা করে বলছিলো, “একদিন একটু কম নিলে হয় না। আজকে দুই টাকা নেন আব্বা।” আমি বলছিলাম কমে হয় না, বেশি দিলে হবে, ৫ টাকা দেন। আব্বু ৩ টাকাই দিছিলো। আমার রুটিন মাফিক ছিলো সেই দিনের সকল কাজগুলো। ৩ টাকার বর্তমান মূল্যমান যদি হিসেব করি সেটা ১০-১৫ টাকা হবে। ঘটনাগুলো ২০০৪-৫ এর দিকের যখন কিন্ডারগার্টেনে পড়তাম। যেমন তখন একটা লাল চা ১ টাকায় পাওয়া যেতো, আবার তালতলা থেকে ঘুইংঘার হাট বাসে গেলে ১ টাকা নিতো। অবশ্য বড়দের কাছে ২ টাকা নিতো। ২-৩ টাকায় ভালো কলম পাওয়া যেতো। আবার পঁচা কাগজের দিস্তা ছিলো ৫-৭ টাকা যদিও সেটায় কখনো লিখা হতো না। তখন এক প্রকার লম্বা কাগজ পাওয়া যেতো যেটায় এক কাগজে ৪ পৃষ্টা হতো। আমার ৩ টাকা খরচের হিসাবটা যদি একটু বলি সেটা এরকম দাড়ায় যে, প্রথম এক টাকা খরচ হতো বাস ভারা দিতে গিয়ে। তারপর স্কুলে গেলে হয়তো ১-২ টাকার কিছু খাইতাম আর যদি স্কুলে না খেয়ে এক টাকা বাচতো সেটা দিয়ে হিন্দু বাড়িতে, মিষ্টির সিরা দিয়ে এক প্রকার চিট বানাইতো। ঘুইংগার বাজারের হিন্দু বাড়িতে গিয়ে ১ টাকায় সেই চিট কিনতাম,এক টাকায় ভালোই দিতো। স্কুল থেকে আসার সময় বন্ধুদের সাথে হেটেই আসতাম। এখানে একটু বলি, সদরে বাসস্ট্যাণ্ড থেকে আমার বাসা কাছাকাছি তো বাস যখন ছাড়ে তখন আমাদের বাজার থেকে তোলে আর ঘুইংগারহাট একটা বড় স্টপেজ ওখানে এমনিতেই থামে। আর বাস ফিরার সময় ঘুইংগার হাটের পর আর থামে না।

তাই ফেরার সময় বাসে চড়া হতো না, বন্ধুদের সাথে হেটেহেটেই আসা হতো। সেই ৩ টাকার দিনগুলো অনেক আনন্দের ছিলো, কোন চাপ ছিলো না, না কোনো টেনশন ছিলো, কারো কথা ভাববার অবকাশ ছিলো না। আজকে আমার পকেটে ৩ টাকা আছে। দুই টাকার একটা কয়েন আর ১ টাকার একটা কয়েন। সকাল থেকে ৮ টাকা ছিলো। টিউশন করি একটা। আসা যাওয়ায় ১০ টাকা খরচ হয়। অটোর পথটার পরেও ভালো একটা পথ রিক্সায় যেতে হয়। রাজশাহী আসার পর সারাদিনে সেই পথটুকুই আমার হাটার সুযোগ তাই টাকা থাকলেও বেশির ভাগ সময় হেটেই যাই। টাকা না থাকলে তো সেটা আরো ভালোই হয়। ভাবছিলাম আজকে টিউশনিতে যাবো না কারণ, যাওয়ার ৫ টাকা দিলেও আসার সময় ৩ টাকা থাকবে সেটা অটোতে দেয়া যাবে না, পুরো পথটাই হাটা লাগবো। তারপরও সময় হওয়ার পর মনে হলো, না যাই সন্ধ্যায় বাসায় বসে থাকতে ভালো লাগবে না, সারাদিনে একেবারে বের না হলে শরীর খারাপ লাগবে, না হয় একটু বেশিই হাটলাম আজকে। যাই হোক টিউশনিতে যাওয়ার পর ২-১ জন বন্ধুর কাছে টাকা ধার চাইলাম একজন কিছু টাকা পাঠানোর কথা বললো। তারভিতর কিছুক্ষণ পর রুমমেট ছোট ভাই কল দিয়ে বললো, ভাই wifi লাইন কাইটা দিছে আপনি ৮০০ এর মতো ম্যানেজ করেন আমি দেখছি। আমি জানি টাকাটা আজকে হবে না তারপরও ছোট ভাইকে আস্বত্ব করলাম। আর আজকে স্টুডেন্টটাও কোমন বেশি তিড়িংবিড়িং করছিলো। নরমালি আমি কখনো ওর গায়ে হাত তুলি না আজকে চড় লাগাইছি একটা, যদিও বেশি জোড়ে না। তবে চড় খেয়ে স্টুডেন্টের মন খারাপ দেখে আমারো মন খারাপ হয়ে গেলো। আজকে রাতের খাবারও সেখানেই হলো, বেশ ভালো খাওয়া দাওয়া, মাছ-গরুর মাংস। খাওয়ার পর্ব চলাকালীন স্টুডেন্টের আম্মুকে টাকার কথাটা বললাম। যদিও আমি কখনোই বলতাম না। ছোট ভাইকে টাকা ম্যানেজ করার কথা বলায় একটু ট্রাই করলাম আন্টিকে বলে যদি হয়। যাই হোক সেটা হলো না, হওয়ার কথাও না। সেখান থেকে বের হয়ে হাটা শুরু করলাম। একটু পরই স্টুডেন্টের আব্বুর সাথে দেখা আঙ্কেল আমাকে দেখে হুন্ডা ঘুরিয়ে বাসায় এগিয়ে দিলেন। লম্বা পথ হাটা লাগলো না। প্রতিদিন যতটুকু হাটি তাও হাটা হলো না। রুমের সামনে এসে ছোট ভাইকে কল দিলাম সে রুমে নাই আমার কাছেও চাবি নাই। ওর আসতে তখনো ১৫-২০ মিনিট লাগবো। হঠাৎ মনে হলো কোনো চায়ের দোকানে বসে একটা চা খেয়ে সময়টা কাটিয়ে দেই। কিন্তু আমার পকেটের কথা মনে পড়লো মানিব্যাগে ৩ টাকা আছে। ঠোটের কোনে একটু হাসি আসলো, পুরোনো দিনগুলির কথা মনে পড়ে গেলো। মনে হলো হয়তো কাল টাকা ম্যানেজ হবে হয়তো হবে না। রুমে wifi নাই কালকের ক্লাসও হয়তো করা হবে না।হঠাৎ মনে পড়লো বিকালেই ৩ টা মুভি নামাইছি। যাইহোক রাতে সময়টা খারাপ কাটবে না। দাড়িয়ে ছোট ভাইকে কল দিলাম চাপ না নিয়া কাজ সেরেই আয়। আমি আস্তে হাটা শুরু করলাম নদীর পড়ে চলে আসলাম। আমার মনে হলো মাঝে মাঝে মস্তিষ্ককে একটু বিশ্রাম দেয়া উচিত। আমার কোন কিছু নিয়াই কোন চাপ নাই। কালকে নাস্তা খাওয়ার মতো সকাল হয়তো হবে না। বুয়াকে বলেছি কালকে টাকা দিবো দুপুরে সে হয়তো খাবার নিয়ে আসবে টাকার জন্য। আমি হয়তো তাকে দিতে পারবো। না থাকলে কি বলতে হবে জানা নাই। অনেক কিছু নিয়ে আমার ভাবা উচিত কিন্তু আমার ভাবনা সুন্দর ছোট বেলার স্মৃতিগুলোর কথা ভেবেই পুলকিত হচ্ছি, দুশ্চিন্তা একটুও আমাকে গ্রাস করতে পারে নি। হয়তো আমি তাকে জয় করে নিয়েছি না হয় আমি চাপ নিতেই ভুলে গেছি। নদীর পারে ব্লকের ধারে বসে নদীর পানিতে জোৎস্না খুব সুন্দর। হঠাৎ হুইসেল শুনতে পেলাম। হয়তো বর্ডারগার্ডের লোক হবে। উঠে যাওয়ার জন্য তাড়া দিলো।

My happiness of three Taka

ওহ আমার পাশে এসে মাঝখানে রুমমেট ছোট ভাইটাও সংগ দিল। দুজন মিলে উঠে গেলাম। এখন রাত ১১ টা বেজে ৭ মিনিট।নদীতে জোৎস্নার আলো এখন আর দেখা যাচ্ছে না। হালকা ঢেউ এর শব্দগুলো আগের মতোই আছে। রুমে ফিরতে হবে, ভাবছি আজকে রাতে Bill & Teds Excellent Adventure মুভিটা দেখবো। এখনো আমার পকেটে ৩ টাকা আছে একবার ভাবছি এই বিখ্যাত ৩ টাকাকে সংরক্ষণ করে রাখবো। পরক্ষণেই মনে হলো অর্থ সংরক্ষণের জন্য না, খরচ করার জন্য সেটা ৩ টাকা হোক বা ৩ কোটি টাকা। আমার এই ৩ টাকার সুখ ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ সাল। সারা পৃথিবী জুড়ে মহামারি  চলছে। এই সময়েও আমার পরিবারের সবাই ৩ বেলা ঠিক মতো খেতে পারি। এরচেয়ে সুখ আর আমি কি চাই। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ আমার ভালো না থাকার মতো কোন কারণ তিনি রাখেন নি। সাময়িক অসুবিধাগুলো হয়তো খুব শিঘ্রই কেটে যাবে ইনশাআল্লাহ 😊।

Do You need an Article? Contract me , FiverrFreelancer (Bangla/English)

2 thoughts on “আমার তিন টাকার সুখ”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *